মলয় দে নদীয়া :-নদীয়ায় উদযাপিত হচ্ছে ফাগুয়া/ সরহুল/বাহা পরব।প্রকৃতির পূজারী অর্থাৎ আদিবাসী সম্প্রদায় মানুষজন এই পরবের আয়োজন করে থাকেন।প্রকৃতির সন্তানরা গাছের তলায় অথবা জাহের থানে পূজা নিবেদন করেন।কথিত আছে কোন এক সভায় শাল গাছের কাছে আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ সত্যের সন্ধান পেয়েছিল। তৈরি হলো শালগাছকে নিয়ে তাদের জাহের।সত্যের সন্ধানী শালগাছকে ” সারি সারজম(sal tree the truth) বলে তারা আজও সম্মান করে আসছে। তবে শুধু সাল কেন প্রতিটি বৃক্ষকে আমাদের সম্মান করা উচিত বলে মনে করি। কারণ গাছের ভূমিকা আমাদের জীবনযাত্রায় উল্লেখযোগ্য।
গাছের পাতা, কাঠ , ফুল, ফল সবটাই জীবনযাত্রার সাথে জড়িয়ে আছে আমাদের। এই সময় সাল সেগুন সহ প্রতিটি গাছে নতুন পাতা এসেছে ফুল ধরেছে তাতে ।তাই তারা মনে করেন তার গায়ে হাত দেওয়ার আগেই তার থেকে অনুমতি নেওয়া অবশ্যই দরকার। তাই এই আয়োজন। এই উৎসব বাংলার নানা প্রান্তে যেখানে আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষজন আছেন তারা নানা নামে এই উৎসব উদযাপন করছেন। যেমন সাঁওতাল সম্প্রদায়ের মানুষ বাহা উৎসব পালন করেন। সাঁওতালি ভাষায় বাহা অর্থাৎ ফুল। পুরুলিয়ায় এই উৎসবকে সাহরুল বলা হয়। সাহারুল অর্থাৎ শাল গাছের ফুল। নদীয়ার মানুষরা বর্তমানে এই ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখলেও তারা শাল ফুল শুধু নয়, অন্যান্য ফুলের ব্যবহার ও করে থাকে।
শীতের রুক্ষতা পার করে বসন্ত ঋতুর আগমনে প্রকৃতি এক অন্যরূপে সজ্জিত হয়।কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা কয়েকটি লাইন বেশ মনে পড়ছে। একই লাবণ্যে পূর্ণ প্রাণ, প্রাণ এসো হে। নতুন পাতা ,ফুল ও তার গন্ধ ভেসে বেড়ায় আকাশে বাতাসে। নানা রঙা পাখিরা যেন ঠিক এই সময়টারই অপেক্ষা করছিল। ঠিক এভাবেই অপেক্ষা করছিল প্রকৃতির পূজারীরা কখন গাছে নতুন পাতা, ফুল আসবে আর তারা প্রকৃতির দেবীকে শ্রদ্ধা জানিয়ে পূজা নিবেদন করবে। ফাল্গুন মাসের দ্বাদশী তিথি থেকে এই পরব আরম্ভ করেন।অমাবস্যার পূর্ণিমার চাঁদ দেখার পর থেকেই ধামসা মাদল ও দুন্দুভির আওয়াজে মেতে ওঠে তারা। এই উৎসব চলবে দোল পূর্ণিমা পর্যন্ত। কোন কোন জায়গায় আবার গ্রামের সকলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নির্দিষ্ট দিনে জঙ্গল থেকে কচিপাতাসহ শালফুলে ভরা ডাল সংগ্রহ করে আনা হয়। আর তার তলায় অপূর্ব ভাবে সাজানো হয় রং আর ফুল পাতা দিয়ে। কোথাও আবার বৃক্ষের নিচেই এই পূজার আয়োজন করা হয়। তাকে ঘিরেই চলে গ্রামবাসীদের ঐতিহ্যবাহী নাচ আর গান।
মধ্যে একটি ছোট কুঁড়েঘর তৈরি হয় যেখানে সারারাত প্রদীপ জ্বলে। তারা বিশ্বাস করেন প্রকৃতির দেবতা, গরাম দেবতা , পূর্বপুরুষেরা তাদের মধ্যেই বিরাজ করছেন।
পরব শেষ না হওয়া পর্যন্ত কেউই নতুন পাতা,ফুল, ফল ব্যবহার করে না।জাহের থেকে আসার সময় নায়কে /লায়া/ পাহান কিছু শালফুল সঙ্গে আনেন। কোথাও আবার গ্রামবাসীরা নিজেরাই পুজো করেন।গ্রামের মেয়েরা প্রত্যেকে থালায় জল আর বাটিতে তেল নিয়ে নিজ নিজ বাড়িতে অপেক্ষা করে পূজারীর। তিনি বাড়িতে প্রবেশ করলে বা পূজো শেষ হয়ে গেলে প্রত্যেক মেয়ে তার পা ধুয়ে তেল মাখিয়ে দেয়। পূজারী তখন তাদের শালফুল /বন্যফুল /গাঁদা /পলাশ ফুল দেন। এই পরব মূলত শাল গাছের ফুলকে কেন্দ্র করেই হয়। তবে বর্তমানে নদীয়াতে সাল ফুল সেভাবে না পাওয়াতে সবরকম ফুল তারা ব্যবহার করে। মূলত জাহের থানে মহিলারা প্রবেশ করে না। নদীয়াতে এ দৃশ্য অন্যরকম মহিলা পুরুষ উভয়ই প্রকৃতির পূজা করে থাকেন। পূজা শেষে যে ফুল থানে উৎসর্গ করা হয়েছিল সেগুলো একে অপরের মাথায় লাগিয়ে দেয়। এই পরবের গানে বিশেষত্ব ধর্মীয় বিশ্লেষণের পাশাপাশি ইহকাল পরকালের আধ্যাত্বিক ব্যখ্যা ও সিদ্ধিলাভের কথা। পরবের গানে তাদের আরাধ্য দেবদেবীর সাজের বর্ণনাও আছে।
বাহা পরবে রং বা আবিরের ব্যবহার নিষিদ্ধ।শুধুমাত্র জল ছেটানোর ছাড়পত্র আছে।তবে সেক্ষেত্রেও সম্পর্ক মেনে চলতে হয়। তবে ফাগুয়া ও সারহুল পরবে গাছের গায়ে আবির লাগানো হয়। এভাবেই প্রকৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা আদি কাল থেকে চলে আসছে যুগ যুগ ধরে।