অভিজিৎ হাজরা, আমতা, হাওড়া :- কবি দেবেন্দ্রনাথ সেন তাঁর ‘ মা ‘ কবিতায় লিখেছেন ” হেরিনু বিন্ধ্যবাসিনী বিন্ধ্যে আরোহিয়া ” । কিন্তু এখন মা বিন্ধ্যবাসিনী মাতা কে দর্শন করতে বিন্ধ্যাচলে না গেলে ও হবে। শারদোৎসবে কৈলাস হতে মা দূর্গা যেমন আমাদের ধূলার ধরণীতে সপরিবারে এসে অবতীর্ণ হন,মা বিন্ধ্যবাসিনী তেমনি বিন্ধ্যাচল পর্বতের গুহা মন্দির থেকে এসে অবতীর্ণ হন আমাদের ধূলার ধরণীতে। উত্তরপ্রদেশের মির্জাপুর জেলার বিন্ধ্যাচল এর গঙ্গা নদীর তীরে অধিষ্ঠাত্রী মা বিন্ধবাসিনী ১৭৪ বছর ধরে পূজিতা হচ্ছেন গ্ৰামীণ হাওড়া জেলার আমতা থানার বর্ধিষ্ণু রসপুর গ্ৰামে। এই গ্ৰামে এই পূজা সম্পর্কে প্রামাণ্য কোনো নথি পাওয়া যায়নি।
জনশ্রুতি অনুসারে জানা যায়,১৭৪ বছর আগে রসপুর গ্ৰাম নিবাসী রসপুর রায়পাড়া – র জমিদার বেণীমাধব বসু পূর্ণাঞ্জনের জন্য তীর্থস্থান করতে উত্তরপ্রদেশের বিন্ধ্যাচল এ যান। সেখানে তিনি গঙ্গা নদীর তীরে অধিষ্ঠাত্রী মা বিন্ধ্যবাসিনী – র মূর্ত্তি দর্শন করেন। মনে মনে সংকল্প করেন তিনি গ্ৰামে ও এই মাতার পূজা করবেন।এরপর তিনি গ্ৰামে ফিরে আসেন। কিছুদিন পর তিনি স্বপ্নাদিষ্ট হন। ” মা বিন্ধ্যবাসিনী মাতা তাকে স্বপ্নে বলেন, ‘ আমি তোর হাতে, তোর গ্ৰামে পূজিতা হতে চাই। তুই ব্যবস্থা কর ‘। তিনি স্বপ্নাদিষ্ট হওয়ার কথা, এবং বিন্ধ্যাচল দেখে আসা বিন্ধ্যবাসিনী মাতা – র মূর্ত্তির বর্ণনা করে গ্ৰামবাসীদের বলেন, তিনি মা বিন্ধ্যবাসিনী মাতা – র পূজা এই গ্ৰামে করতে চান। এরপর গ্ৰামবাসীদের মিলিত প্রচেষ্টায় ১৭৪ ধরে নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে এই পূজা চলে আসছে। যদিও মাঝে ‘ করোনা মহামারির ‘ সময়ে দু ‘ বছর এই পূজা হয় নি। প্রতি বছর ফাল্গুন মাসের শুক্ল পক্ষের সপ্তমী তিথি হতে দশমী তিথি চারদিন ব্যাপী মহাসমারোহে পূজা হয়। দূর্গা পূজার মত পঞ্চমী তিথি থেকে পূজার আড়ম্বর শুরু য়ে যায়। দূর্গা পূজার আনন্দ স্থানীয় বাসিন্দারা এই পূজায় করে থাকেন। রসপুর গ্ৰামের যে স্থানে বিন্ধ্যবাসিনী মাতার পূজা হয়ে থাকে সেই স্থানটি মায়ের নামানুসারে ‘ বিন্ধ্যবাসিনী তলা ‘ নামে পরিচিত লাভ করেছে। রসপুর গ্ৰামের বিন্ধ্যবাসিনী তলায় বর্তমানে পাকা মন্দির নির্মাণ হয়েছে। এই মন্দিরে প্রতি বছর ফাল্গুন মাসের শুক্লা পক্ষের সপ্তমী তিথি থেকে দশমী তিথি পর্যন্ত এই চারদিন বিন্ধ্যবাসিনী মাতার পূজা হয়ে থাকলেও মন্দিরে দেবী অধিষ্ঠান করেন দেড়মাস ব্যাপী পরবর্তী বছরের বৈশাখ মাসের শুক্লা পঞ্চমী তিথি পর্যন্ত।১০ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট বিন্ধ্যবাসিনী মাতা অষ্টভূজা, ত্রিনয়নী, তপ্ত কাঞ্চন বর্ণা, বিভিন্ন হস্তে বিভিন্ন অস্ত্রে সুসজ্জিতা।সিংহদ্বয় বাহন, এছাড়া সর্প ও রয়েছে।প্রতিমার পাশে জয়া – বিজয়া সহ দেবীর উপরে অন্যান্য দেব – দেবীর অধিষ্ঠান। পতাকা হস্তে দেব গণের অধিষ্ঠান। সপ্তমী তিথিতে পুজা সহ ১ টি পাঁঠা বলি, অষ্টমী তিথিতে নিরামিষ,ধূনাপোড়া,দন্ডিকাটা হয়ে থাকে।নবমী তিথিতে একটি পাঁঠা বলি সহ একটি মহিষ বলি হয়।চারদিন ব্যাপী এই পূজা মন্ডপে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের বহু ভক্তবৃন্দের সমাগম ঘটলে ও দেড় মাস ব্যাপী বহু ভক্তবৃন্দ বিন্ধ্যবাসিনী মাতাকে দর্শন করতে আসেন। রসপুর গ্ৰাম ছাড়াও পার্শ্ববর্তী গ্ৰামের গ্ৰামবাসীদের সমাগম ঘটলে ও কলকাতা সহ রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের বহু ভক্তবৃন্দের সমাগম ঘটে দেড় মাস ব্যাপী। রসপুর গ্ৰামের স্বর্গীয় জগন্নাথ দাস ও অখিল চন্দ্র দাস মন্দির নির্মাণে ও তৎসংলগ্ন জমি নিঃস্বর্তে দান করেছেন। পূর্বে টালি ছাউনী ও বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘেরা মন্দির ছিল। বতর্মানে পাকা মন্দির নির্মাণ হয়েছে। দেবীর কোনো স্থায়ী সম্পত্তি নেই।গ্ৰামবাসী ও জনসাধারণের অর্থ ও পূজার আনুষঙ্গিক অন্যান্য দানে পূজা হয়। শুরু থেকেই এই পূজা উপলক্ষে এক মাস থেকে দেড় মাস ব্যাপী মেলা চলতো। পরে মেলার দিন সংখ্যা কমে যায়।বেশ কয়েক বছর আগে পর্যন্ত ১৫ দিন ব্যাপী মেলা বসত। বতর্মানে ৫ দিন ব্যাপী মেলা বসে। বতর্মানে এই পূজা রসপুর ইউনিয়ন ক্লাব এর ব্যবস্থাপনায় ও রসপুর গ্ৰামবাসীদের সহযোগিতায় ও পরিচালনায় সব্বজনীন শ্রী ঁ বিন্ধ্যবাসিনী মাতার পূজা ও উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। পূজা উপলক্ষে ম্যাজিক শো, তরজা গান, পুতুল নাচ, কথকতা, হরিনাম,কেষ্ট যাত্রা,রাম যাত্রা,বস্ত্র উপহার,বসে আঁকো প্রতিযোগিতা,যেমন খুশি সাজো প্রতিযোগিতা, স্লো – সাইকেল প্রতিযোগিতা, মিউজিক্যাল চেয়ার প্রতিযোগিতা, সংগীত, নৃত্য, আবৃত্তি প্রতিযোগিতা, এলাকার কলাকুশলীদের নিয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নাটক,যাত্রা অভিনীত হয়। এছাড়াও পূজা উপলক্ষে সমাজসেবা মূলক কর্মসূচির অঙ্গ হিসাবে থাকে রক্তদান শিবির, স্বাস্থ্য পরীক্ষা শিবির। পূর্বে পূজার দিন গুলিতে বিশাল অশ্বস্থ গাছের উপর বাঁশের মাচা তৈরি করে বসত সানাই , নহবত ।যা আজ অতীত।
পূজা উপলক্ষে নরনারায়ন সেবা অনুষ্ঠিত হয়।নরনারায়ন সেবায় ধর্ম – বর্ণ -নির্বিশেষে প্রায় ১৫ থেকে ১৬ হাজার ভক্তবৃন্দ সুষ্ঠ ভাবে প্রসাদ গ্ৰহণ করে থাকেন। এই পূজা প্রসঙ্গে রসপুর হাই স্কুল এর সহকারী শিক্ষক কালিপদ রুইদাস কিছু অলৌকিক কাহিনীর বর্ণনা দিয়ে বলেন, ” এক বৎসর প্রতিমার নির্মাণ কাজ শেষ হয়ে গেছে । চোখ আঁকাও হয়ে গেছে। মিস্ত্রী বাড়িও চলে গেছে। পরদিন দেখা যায় প্রতিমার চোখ বন্ধ হয়ে গেছে।গ্ৰামবাসীরা তা দেখে কয়েকজন গ্ৰামবাসী পাশের গ্ৰাম থলিয়ায় প্রতিমা শিল্পী কুম্ভকারের নিকট যাওয়ার উদ্দেশ্যে রহনা হন।পথে দেখেন দামোদর নদ পার হয়ে রঙের বাটি ও তুলি সহ প্রতিমা শিল্পী আসছেন।সকলে তা দেখে অবাক হয়ে যান।শিল্পী বলেন,’ গত রাত্রে তিনি স্বপ্নে জানতে পেরেছেন দেবীর চোখ ঢাকা পড়ে গেছে। তাই তিনি ছুটে আসছেন দেবীর নিকট ‘।মা বিন্ধ্যবাসিনীর নির্দেশ পেয়েই শিল্পী মূর্ত্তির চোখ ঠিক করে দেন ” । মহিষ বলি প্রসঙ্গে তিনি যে কাহিনী বলেন,তা হল ,বহু বছর পূর্বে কোনো এক বছর মহিষ বলির পর তার মাংস যা কিনা সেই সময় স্থানীয় চর্মকার সম্প্রদায়ের মানুষ ভক্ষণ করত, সেবার তারা কোনো কারণ ছাড়াই বলির মাংস নিয়ে গিয়ে তা ভক্ষণ না করে মাটিতে পুঁতে দিয়েছিল। অচিরেই সেই এলাকায় কলেরা মহামারির আকার নিয়েছিল।প্রচন্ড ভীত হয়ে ঐ এলাকার মানুষ মাটিতে পুঁতে দেওয়া মাংস তুলে এনে তা পরিষ্কার করে তা খেতে বাধ্য হয়েছিল ‘ । তিনি আরও একটি অলৌকিক কাহিনীর বর্ণনা করে বলেন,’ একবার মহিষ বলি দানের পূর্ব মুহূর্তে মহিষকে স্নান করিয়ে হাঁড়ি কাঠে গলা প্রবেশ করিয়ে উপরে দন্ড এঁটে দেওয়ার পর কামার বলি দিতে উদ্দত হলে সেই মুহূর্তে মহিষ টি হাঁড়িকাঠ মাটি থেকে উপড়ে নিয়ে পাশের হাঁড়িকাঠ সহ নিকটবর্তী একটি পুকুরে পড়ে যায়। তার পর বহু চেষ্টার পর মহিষটিকে পুকুর থেকে তুলে এনে বলি দিয়ে বলির কাজ সমাপ্ত করা হয়। পুরোহিত এই ঘটনা প্রসঙ্গে বলেছিলেন পুজায় কোনো বিচ্যুতির কারণে এই ঘটনা ঘটেছে ” । আরও একটি প্রচলিত বিশ্বাস আছে,যা আজও অধিকাংশ মানুষের মধ্যেই আছে । তা হল , অনেকেই মহিষ বলিদানের পর মহিষের কাটা মুন্ডু বা ধড় থেকে বের হওয়া রক্ত শিশি বা বোতলে সংগ্ৰহ করে,রক্ত ভেজা মাটি সংগ্রহ করে থাকে।ওই রক্ত কিংবা রক্ত ভেজা মাটি নাকি মানুষের শরীরে লাগালে কঠিন বা জটিল রোগের নিরাময় হয়। রসপুর গ্ৰামের বিন্ধবাসিনী মাতা ফাল্গুন মাসের শুক্লা সপ্তমী তিথি থেকে পরবর্তী বছরের বৈশাখ মাসের শুক্লা পঞ্চমী তিথি পর্যন্ত অধিষ্ঠান করে, বৈশাখ মাসের শুক্লা পঞ্চমী তিথিতে স্থানীয় দামোদর নদ এ বিসর্জিত বা নিমজ্জিত হয়। বলি বন্ধ করে দেওয়ার প্রসঙ্গে পূজা কমিটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য কুন্তল দাস সহ অন্যান্যরা বলেন, রসপুর ইউনিয়ন ক্লাব এর সদস্যরা মহিষ বলি বন্ধ করে দিতে চান। কিন্তু গ্ৰামবাসীরা তাদের অন্ধ বিশ্বাসে বলি বন্ধ করতে চান না।গ্ৰামবাসীদের বিশ্বাস বলি বন্ধ করে দিলে এই গ্ৰামের মানুষের উপর মায়ের কোপ বর্ষিত হবে।মহমারি – মড়ক লেগে বহু মানুষের অকাল মৃত্যু হবে। ক্লাবের সদস্যদের গ্ৰামবাসীরা বলেন,বলি বন্ধ করে দিলে গ্ৰামে মায়ের রোষের কোপ পড়লে তার দায়ভার ক্লাবের সদস্যদের নিতে হবে।গ্ৰামবাসীদের এই বিশ্বাসের কাছে নতিস্বীকার করে আমরা বলি বন্ধ করতে পারছি না।