স্কলারশিপের টাকায় পড়াশোনা করে অর্ণব হতে চলেছে গবেষণায় ডক্টরেট

Social

মলয় দে নদীয়া: কথায় বলে ইচ্ছে থাকলে উপায় হয়। যার কেউ নেই তার ভগবান আছে। জন্ম নেয় অভাবের ঘর থেকেই, এরকমই নানান প্রবাদ বাস্তবায়িত হয়েছে নদিয়ার শান্তিপুরের যুবক অর্ণব চ্যাটার্জির ক্ষেত্রে।

শত দারিদ্রতার মধ্যেও সিএসআইআর-ইউজিসি
নেট পরীক্ষায় গোটা নদীয়া ,পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতবর্ষের মুখ উজ্জ্বল করেছে সে । বিশেষত যেসব ছাত্রছাত্রীরা বিজ্ঞান বিষয় নিয়ে মাস্টার ডিগ্রী সম্পূর্ণ করেছে তারাই এই পরীক্ষায় বসার সুযোগ পায়। এই পরীক্ষায় র‍্যাঙ্ক ভালো হলে পরে পরবর্তীকালে যারা রিসার্চ অর্থাৎ পিএইচডি করতে চায়, তাদের একটি আর্থিক সাহায্যের সুযোগ থাকে। যেটিকে বলা হয় জুনিয়ার রিসার্চ ফেলোশিপ।

শান্তিপুরের যুবক অর্ণব চ্যাটার্জি এর আগেও নেট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন এবং তার সেই সময়ে র‍্যাঙ্ক হয়েছিল ১০১। তবে বেশ কিছুদিন আগেই সিএসআইআর ইউজিসি নিট পরীক্ষায় শুধুমাত্র তিনি যে এলএস কমপ্লিট করেছেন তা নয়, তার সঙ্গে যে জুনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পরীক্ষা দিয়েছিলেন তাতেও তিনি উত্তীর্ণ হয়েছেন। এবং সেখানে ওই যুবক ভারতের মধ্যে র‍্যাঙ্ক করেন ৯১।

শান্তিপুরের বাসিন্দা অর্ণব নামের ওই যুবক বর্তমানে কল্যাণী ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি করছেন। এবং পিএইচডি করার জন্য এই পরীক্ষাটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিলো বলে জানায় সে। পিএইচডি সম্পন্ন করতে যে অর্থের প্রয়োজন হয় তা এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার ফলে সিএসআইআর থেকে আর্থিক সাহায্য পাবেন সে। যেটি ওই যুবকের পরিবারের কাছে খুবই স্বস্তির খবর বলে জানা যায়। শুধু পড়াশোনা নয়, বাবার আর্থিক সচ্ছলতা না থাকায় সংসার অতিবাহিত করতেও বেশ খানিকটা কাজে লাগে বলে জানা গেছে।

তিনি জানান তার পরিবারের আর্থিক অবস্থা, খুব একটা ভালো নয়। পরিবারে রয়েছেন মা এবং বাবা। বাবা গৃহশিক্ষক বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিউশনি পড়ান। যা থেকে সামান্য কিছু রোজগার হয় তবে পড়াশোনার পুরো খরচ যোগাড় করা সম্ভব হয় না।ছোটবেলা থেকেই আর্থিক অবস্থা ভালো না থাকার কারণে বিভিন্ন স্কলারশিপের মাধ্যমে আর্থিক সাহায্য পেয়ে তিনি এগিয়ে গেছেন তার ভবিষ্যতের পড়াশোনার জন্য। অর্থাভাবে এখনকার online coaching-র রমরমার যুগেও বাড়িতে self study করে সাফল্য পেয়েছে.. এবার পিএইচডি করার জন্য এবং ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়ার জন্য এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার ফলে অনেকটাই বিশেষ করে আর্থিক দিক থেকে সুবিধা হল ওই যুবকের বলে জানায় সে।
পারিবারিক সমস্যার কারণে তাদের পৈতৃক ভিটে কলকাতা থেকে মাত্র তিন বছর বয়সে তাকে নিয়ে তার বাবা-মা ভাড়া এসেছিলেন শান্তিপুরে , ২৫ বছরে শান্তিপুরেরই বিভিন্ন পাড়ায় আনুমানিক বারটি বাড়িতে ভাড়া রয়েছে তারা। প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও পারিবারিকভাবেও সাহায্য থেকে বঞ্চিত… তবে অর্ণব জানায়, প্রতিষ্ঠিত হয়ে মা-বাবার পাকাপাকিভাবে নিজস্ব মাথা গোঁজার একটি ঠাঁই করে দেবে সে। এরপর অভাবের তাড়নায় যারা ডাক্তারি পড়তে তার মতোই সমস্যায় তাদেরকে স্কলারশিপ দেবে সে। তবে ডাক্তার হতে না পেরে, অর্ণব কিছুটা দুঃখিত হলেও, সামনেই তার ডক্টরেট উপাধি হাতছানি দিচ্ছে।
পড়াশোনা ছাড়াও, মায়ের সাথে গল্পের বই পড়া, সিনেমা দেখাতে তার আগ্রহ।
মা পূর্ণিমা চ্যাটার্জী জানান, শ্বশুরবাড়ি এবং বাপের বাড়ি দুদিক থেকে সকলেই প্রতিষ্ঠিত কিন্তু কেউ কোনদিন ছেলেকে একটা বই পর্যন্ত কিনা দেয় নি, করোনা পরিস্থিতির মধ্যে পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিলো।তবে বিভিন্ন রকম স্কলারশিপই বাঁচিয়ে রেখেছিল তাদের।
বাবা অলোক চ্যাটার্জি বলেন, দীর্ঘদিনের পড়ানোর অভিজ্ঞতা থেকে বুঝতে পেরেছিলাম অভাবের ঘর থেকেই জন্ম নেয় প্রতিভা। ছেলেকে মাধ্যমিক পর্যন্ত ওর মা এবং আমি নিজেরাই পড়িয়েছি। পরবর্তীতে বারোটি বছর ওর নিজের স্কলারশিপের টাকায় পড়েছে নিজেই। তবে সকল শিক্ষক শিক্ষিকা না হলেও কেউ কেউ আন্তরিকতায় বই এবং পড়াশোনা বিষয়ে অনেকটাই সহযোগিতা করেছে। অর্ণবকে ছোটবেলা থেকে কখনো পড়তে বসতে বলার প্রয়োজন হয়নি। পুজোর সময় নতুন জামা কাপড়ের বদলে বই কিনতো, নিজের ছেলে বলে নয়, প্রতিভা লক্ষ্য করেছিলাম তখন থেকেই। তবে শুধু পড়াশোনায় ভালো নয়, অর্নবের মন মানসিকতা আদর্শবান হয়ে ওঠা সবটাই ওর মার জন্য।

Leave a Reply