অতনু ঘোষ ও সত্যনারায়ণ শিকদার, পূর্ব, বর্ধমান: হিন্দু ধর্ম ও বৈষ্ণব ধর্মের বহু পুরনো নিদর্শন বহন করে পূর্ব বর্ধমান জেলার কুলীন গ্রাম।
‘শ্রীকৃষ্ণবিজয়’-এর কবি মালাধর বসুর জন্মস্থান এই কুলীনগ্রাম ৷ কুলীন শব্দের অর্থ হল মর্যাদা -সম্পন্ন বংশের সন্তান৷ কুলীনগ্রাম নামের সার্থকতা বোধ হয় এই গ্রামের সুসন্তানদের জন্যই৷ মালাধর বসু জন্মগ্রহণ করেছিলেন পঞ্চদশ শতাব্দীর প্রথম ভাগেই৷ শ্রীমদ্ভাগবত ও ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ অবলম্বনে তাঁর শ্রীকৃষ্ণবিজয়ের রচনাকাল ১৪৭৩ -৮০ খ্রিস্টাব্দ৷ অর্থাৎ শ্রীচৈতন্যের আবির্ভাবের আগেই রচিত হয়েছিল এই কাব্য৷ মালাধর বসুর পৌত্র রামানন্দ বসু ছিলেন শ্রীচৈতন্যদেবের খুবই অন্তরঙ্গ ৷ বসু পরিবারের আমন্ত্রণেই শ্রীচৈতন্যদেব কুলীনগ্রামে আসেন এবং তিন দিন অবস্থান করেন৷ এই ঘটনার সমর্থন ‘চৈতন্যমঙ্গল ’-এ আছে৷
বসু পরিবারের কৃষ্ণভক্তিতে প্রীত হয়ে শ্রীচৈতন্যদেব প্রতি বছর পুরীতে স্নানযাত্রায় কুলীনগ্রাম থেকে পট্টডোরি পাঠানোর দায়িত্ব দেন৷ পট্টডোরি হল তুলোর উপর নানা রঙের রেশম সুতো দিয়ে পাকানো কাছি বা দড়ি ৷ এই কাছি দিয়েই জগন্নাথ , বলরাম , সুভদ্রাকে রথের সঙ্গে বাঁধা হত এবং গলায় মালার মতো পরানো হত৷ পরবর্তীকালে এই পট্টডোরি পাঠানো যে কোনো কারণবশত বন্ধ হয়ে যায় ৷
কথিত আছে , লক্ষ্মীনাথ বসু প্রতিষ্ঠা করেন জগন্নাথ মূর্তির৷ স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে , জগন্নাথ বিগ্রহ পাঁচশো বছরেরও বেশি পুরনো হলেও রথযাত্রার প্রচলন হয় অনেক পরে৷ কুলীনগ্রামের রথযাত্রা উত্সবের প্রচলন হয় অনধিক দু’শো বছর আগে৷ বর্তমানে যে রথ টি আছে তা 50 বছর আগের তৈরি রথ – প্রথমে যে রথটি ছিল সেটি নষ্ট হয়ে গিয়েছে।
কুলীনগ্রামে বহু প্রাচীন দেবদেবীর মূর্তি এবং মন্দির আছে৷ তার মধ্যে অন্যতম হলো গোপাল মন্দির। কথিত আছে রাজা বল্লাল সেনের আমলে তৈরি হয় এই গোপাল মন্দির। স্থানীয় লোকজনদের কাছ থেকে জানা যায় যে এখানে গোপাল স্বয়ং নিজে আবির্ভূত হয়েছিলেন। গোপাল মন্দির এর সামনে আছে একটি বড় জলাশয়, যার নাম গোপাল দিঘী। এই দিঘিতে স্নান করা গঙ্গাস্নানের সমতুল্য বলে মনে করেন এলাকার অনেকে।
সারা বছর বিভিন্ন তিথিতে এই মন্দিরের অনুষ্ঠান লেগেই থাকে এবং অনুষ্ঠান উপলক্ষে দূর-দূরান্ত থেকে বহু মানুষের সমাগম হয়। স্থানীয় বয়স্ক মানুষদের কাছ থেকে জানা যায় যে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু যে বার পুরী গিয়েছিলেন সেবার এই গোপাল মন্দিরে হয়ে পুরীর উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিলেন।
কুলীন গ্রাম বর্ধমান জেলার জামালপুর ব্লকের আবুজহাটি -২ গ্রাম পঞ্চায়েতের অন্তর্গত৷ বর্ধমান -হাওড়া কর্ড লাইনে জৌগ্রাম স্টেশনে নেমে টোটো বা ট্রেকারে চেপে যেতে হয় কুলীনগ্রামে৷ জৌগ্রাম স্টেশন থেকে দূরত্ব মোটামুটি ৬ কিলোমিটার৷ আবার হাওড়া বর্ধমান মেইন লাইনে দেবীপুর স্টেশনে নেবে টোটো বা ট্রেকারে করেও যাওয়া যায়।
প্রতিবেদনটি স্থানীয় মানুষদের মুখে শোনা কথার উপর নির্ভর করে তৈরি।