তারকেশ্বরের প্রথম পুরোহিত ‘চতুর্ভুজ গঙ্গোপাধ্যায়’

Social

মানব মন্ডল: বনমধ্যে তারকেশ্বর শিবের শিলাটিকে খুঁজে পান রাজা ভারমল্লের গোয়ালা মুকুন্দ ঘোষ। রাজা ভারমল্ল অনেক চেষ্টা করেও সেই শিবশিলাকে নিজ গড় রামনগরে আনতে পারেননি। শেষে স্বপ্নাদেশ প্রাপ্ত হয়ে অধুনা তারকেশ্বরেই শিবশিলার প্রতিষ্ঠা ও মন্দির নির্মাণের পরিকল্পনা করেন। তারকনাথের খ্যাতি চারিদিকে ছড়িয়ে পড়লেও কোন রাঢ়ীয় ব্রাহ্মণ তারকনাথের পুজো করতে আসতেন না। কারণ তারকনাথ ছিলেন “গোয়ালা” কর্তৃক আবিষ্কৃত দেবতা। হাওড়া জেলার উদয়নারায়ণপুরের দক্ষিণে একটি গ্রামের নাম শিংটি শিবপুর। তারকেশ্বর থেকে এই গ্রামের দূরত্ব আন্দাজ ৩০ কিলোমিটার হবে। এই শিংটি শিবপুর গ্রামেই বাস করতেন চতুর্ভুজ গঙ্গোপাধ্যায় নামে একজন নিষ্ঠাবান, পণ্ডিত ও সুদর্শন ব্রাহ্মণ। অন্য সব রাঢ়ীয় ব্রাহ্মণদের মত তিনিও তারকনাথকে “গোয়ালার ঠাকুর” বলে অবজ্ঞার চোখেই দেখতেন। গ্রামের পুস্করনীতে স্নান করতে যাবার পথে একদিন চতুর্ভুজের সাথে এক ব্রাহ্মণের দেখা হল। তিনি কথায় কথায় চতুর্ভুজের কাছে তারকেশ্বরের প্রসঙ্গ উত্থাপন করলেন এবং তাঁকে তারকেশ্বরের পুরোহিত হবার প্রস্তাব দিলেন। চতুর্ভুজ বললেন,“ দ্বিজবর, আমি শুনেছি যে জলার মধ্যে গোপের ঠাকুর তারকনাথের আবির্ভাব হয়ছে। কিন্তু আমি শুদ্ধ রাঢ়ীয় ব্রাহ্মণ। আমি গোপের ঠাকুরের পুজো করলে আমার জ্ঞাতি বন্ধুবান্ধব সবাই আমার নিন্দা করবে। আমার হাতে কেউ অন্নজল অবধি খাবে না। এর চেয়ে আমার মরণ ভাল।” এই কথা বলে চতুর্ভুজ সেই আগন্তুক ব্রাহ্মণকে এড়িয়ে যেতে চাইলেন। সেই সময় ব্রাহ্মণ বললেন—

“ গোপের ঠাকুর বলি হেয় জ্ঞান কর।
সে নহে সামান্য লোক শুন দ্বিজবর।।
দেখ পূর্ণ সনাতন আপনি শ্রীরাম।
ভক্তিতে গেলেন গুহ চণ্ডালের ধাম।।”
ব্রাহ্মণ আরও বললেন–
“ ভ্রান্তি ত্যাজি শান্ত হও শুন সার বাণী।
বিপ্র হয়ে হইয়াছ ঘোর অভিমানী”
চতুর্ভুজ আশ্চর্য হয়ে গেলেন। কে এই আগন্তুক ব্রাহ্মণ? তাঁর মনের অন্তরে জমে থাকা অজ্ঞানের অন্ধকার কে এইভাবে দূর করলেন? তিনি ব্রাহ্মণের পায়ে পড়ে বললেন, “ প্রভু, কে আপনি? আপনার পরিচয় দিন। আপনার স্বরূপ আমায় দেখবার সুযোগ দিন।”

আগন্তুক ব্রাহ্মণ বললেন, “ বৎস, কাল সকালেই রওনা হয়ে যাও। জ্ঞাতি, আত্মীয় যারা এর জন্য তোমায় তিরস্কার করবে, তাদের কথা ভেবো না। নিজ দোষেই তারা শাস্তি পাবে। তুমি নির্ভয়ে তারকনাথের পৌরোহিত্য গ্রহণ কর। কোন ত্রুটি হলে আমি কিছু মনে করব না কথা দিলাম। তবে দেখো যেন কদাচার না হয়। তাহলেই কিন্তু সর্বনাশ হবে।”

সেই আগন্তুক ব্রাহ্মণ কিন্তু নিজের রূপ দেখালেন না। যথাসময়ে চতুর্ভুজ তাঁর সেই রূপ প্রত্যক্ষ করবেন এই বলে ব্রাহ্মণ বিদায় নিলেন। স্বয়ং মহাদেব তাঁকে ব্রাহ্মণবেশে এসে তারকনাথের পৌরোহিত্য গ্রহণ করতে আদেশ দিয়েছেন এই ভেবে চতুর্ভুজ পরদিন সকালেই তারকেশ্বর যাবার পরিকল্পনা করলেন।
শিবের নাম স্মরণ করে সকালবেলা চতুর্ভুজ রওনা দিলেন। দুপুরেই পৌঁছে গেলেন তারকেশ্বর ধামে। সজল নয়নে মন্দির প্রদক্ষিণ করে শিবগঙ্গায় স্নান করলেন। তারপর মন্দির সম্মুখে দাঁড়িয়ে ভক্তিভরে মহাদেবকে বারংবার প্রণাম করতে লাগলেন। সেইসময় মুকুন্দ এসে উপস্থিত হলেন। সুদর্শন ব্রাহ্মণকে দেখেই মুকুন্দ ঘোষ বুঝতে পারলেন যে অবশেষে এতদিনে কোন রাঢ়ীয় ব্রাহ্মণ তারকনাথের পূজা করতে এসেছেন। দুজনের দেখা হল, আনন্দপূর্ণ বাক্যালাপ হল। ব্রাহ্মণ মুকুন্দর প্রশংসা করে বললেন —
“দ্বিজ বলে ধন্য তুমি মহা পুণ্যবান।
না দেখি সংসারে ভক্ত তোমার সমান।।”
মুকুন্দ চতুর্ভুজ গঙ্গোপাধ্যায় মহাশয়ের জন্য মন্দিরের কাছেই থাকার ব্যবস্থা করলেন। নবাগত ব্রাহ্মণের পৌরোহিত্যে সন্ধেবেলায় তারকনাথের সন্ধ্যারতি সম্পন্ন হল। গীতবাদ্যের ধ্বনিতে ও ভক্তদের কোলাহলে তারকেশ্বর মুখরিত হয়ে উঠল।
কথিত আছে সেই ব্রাহ্মণের রূপ ধরে স্বয়ং শিবই এসেছিলেন চতুর্ভুজের কাছে। দিয়েছিলেন ধর্মাধর্মের উপদেশ।

ছবি: গুগোল

Leave a Reply