রাজ্যের প্রথম অভিনবত্বের আলোকের মোড়কে রথের ক্যার্ণিভ্যাল ও রথের প্রতিযোগিতা

Social

অভিজিৎ হাজরা,আমতা:- ‌ হুগলী জেলার জাঙ্গিপাড়া থানার অন্তর্গত রহিমপুর নবারুন সংঘ – র সংস্কৃতি চর্চা কেন্দ্র ‌” সুচেতনা ” রথযাত্রা উৎসব উপলক্ষে আয়োজন করেছিল এক ব্যতিক্রমী ও নান্দনিক এবং অভিনবত্বের আলোকের মোড়কে এক মজার উৎসব।যার নাম রথের ক্যার্ণিভ্যাল ও রথের প্রতিযোগিতা।উৎসব প্রাঙ্গণে প্রবেশ পথে দেখা গেলো , ছোট ছোট ক্ষুদ্র কচিকাঁচা শিশুরা তাদের মনোমত রথ সাজিয়ে নিয়ে প্রভু জগন্নাথদেবকে রথে বসিয়ে প্রত্যেকেই চলেছেন ” নবারুন সংঘ ” – র উৎসব প্রাঙ্গণের পথে। এই রথের কার্ণিভ্যাল এবং রথের প্রতিযোগিতা প্রসঙ্গে এই মজার উৎসব যার মস্তিষ্ক প্রসূত ‘ রহিমপুর নবারুন সংঘ ‘ – র সম্পাদক গৌতম বাকুলী বলেন, ” বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় শিশু থেকে কিশোর, কিশোর থেকে যুবসমাজ আজ অপসংস্কৃতির জোয়ারে ভেসে যাচ্ছে।গ্ৰাম বাংলায় খেলার মাঠ আছে – কিন্তু খেলাধুলা করার ছেলে পাওয়া যায় না।শিশু থেকে কিশোর, কিশোর থেকে যুবসমাজ নতুন কিছু সৃষ্টি করা এবং নিজেদের সুপ্ত প্রতিভাকে বিকশিত করার জন্য সচেষ্ট নন।তারা এখন মোবাইলে ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, চ্যাট, নানান,গেম,পর্ণগ্ৰাফী ছবি দেখতে ব্যস্ত থাকে।তারা অপসংস্কৃতির জোয়ারে গা ভাসিয়ে দিয়ে নিজেদের যেমন সর্বনাশ করছে অপরদিকে সমাজের ও দেশের সর্বনাশ করছে। এদের সুস্থ সংস্কৃতির আঙিনায় ফিরিয়ে আনতে, এদের নতুন নতুন সৃষ্টির উৎসাহ প্রদান ও নিজেদের সুপ্ত প্রতিভাকে তুলে ধরার জন্য আমরা সচেষ্ট। আমাদের রহিমপুর নবারুন সংঘ – র একটি যাত্রাদল আছে।যার নাম রহিমপুর নবারুন নাট্যতীর্থ। আমরা এই নাট্যদলের মাধ্যমে গ্ৰামের শিশু, কিশোর – কিশোরী, যুবক – যুবতীদের নিয়ে যাত্রা , নাটক অভিনয় করে থাকি। আমাদের অভিনয় জেলার মঞ্চ গুলিতে সীমাবদ্ধ নয়।আমরা সারা রাজ্য ব্যাপী বিভিন্ন মঞ্চে অভিনয় করে প্রশংসিত হয়েছি এবং হচ্ছি।এর ফলে শিশু, কিশোর – কিশোরী, যুবক – যুবতীদের মধ্যে অভিনয়ের সুপ্ত প্রতিভা ফুটে উঠছে।২০২১ সালে রথের দিন আমাদের সংঘে আগামী দিনের যাত্রাপালা অভিনয়ের পরিকল্পনা নির্ধারনের জন্য সদস্য – সদস্যা, কমিটির সদস্য – সদস্যা বৃন্দ একত্রিত হয়েছিলাম সংঘ গৃহে। সেই সময় লক্ষ্য করলাম আমাদের গ্ৰামের কয়েকজন শিশু নিজেদের কেনা রথ নিয়ে তাকে তাদের মনমতো করে সাজিয়ে রথ নিয়ে রাস্তার এদিক – ওদিক করছে। তখন তাদের আমি জিজ্ঞাসা করি,তোমরা কি করছো।তারা বললো আজকে রথ।তাই আমরা রথ টানছি। জিজ্ঞাসা করলাম, এই রথ নিয়ে কোথায় যাবে।তারা বললো, আমার বাড়ি থেকে ওর যাবো।ওর রথ আমার বাড়ি আসবে। অর্থাৎ পাড়ার মধ্যে একজনের বাড়ি থেকে অন্য জনের বাড়ি।এটা দেখে আমার মধ্যে একটা চিন্তা ধারা উদয় হয়। এদের এই ইচ্ছা ও রথ টানার বিচ্ছিন্ন আনন্দকে যদি আমরা এক জায়গায় আনতে পারি এবং তাদের সৃষ্টিকে উৎসাহিত ও মান্যতা দিয়ে যদি প্রতিযোগিতার মাধ্যমে করি তাহলে, তাদের সৃষ্টির আনন্দে তারা মেতে উঠবে এবং তাদের মনের বাসনা পূরণ হবে এবং আনন্দ ও হবে। অপরদিকে নতুন নতুন করে রথ তৈরি ও সাজানোর উৎসাহ পাবে। আমার ইচ্ছার কথা সংঘের সকলের কাছে জানানোয়,তারা সকলেই আমার প্রস্তাব মেনে নেয়।ঠিক হয় পরের বৎসর রথের পুর্ণযাত্রার দিন (উল্টো রথের দিন) করা হবে। প্রস্তুতি শুরু হয়।২০২১ সালের রথের পুর্ণযাত্রার দিন আমরা এই রথের প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছিলাম।অল্প দিনের প্রস্তুতিতে সেই বছর পনেরো জন প্রতিযোগী অংশগ্রহণ করেছিল। তার পরের বৎসর ২০২২ সাল থেকে রথের দিনই এই প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। পশ্চিমবঙ্গের আর কোনো জেলায় এই প্রতিযোগিতা হতো না।আমরাই প্রথম চালু করি। আমাদের অনুসরণ করে এখন রাজ্যের বিভিন্ন জেলার বিভিন্ন সংগঠন এই রথের প্রতিযোগিতা করছে।যেটা ভালো লক্ষণ। আমাদের এখানে প্রতিযোগিতার বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে প্রতিযোগীর সংখ্যা বাড়ছে। এই বৎসর রথের কার্ণিভ্যাল এবং রথের প্রতিযোগিতায় তেয়িশটি গ্ৰুপ অংশগ্রহণ করেছে। রথের কার্ণিভ্যাল এবং রথের প্রতিযোগিতায় শুধুমাত্র হুগলী জেলার প্রতিযোগীরা নন, পাশ্ববর্তী হাওড়া, মেদিনীপুর সহ অন্যান্য জেলার প্রতিযোগীরা অংশগ্রহণ করে। আমরা শিশু ও যুব সমাজকে রক্ষা করার জন্য সচেষ্ট আছি। এদের পাশাপাশি আমরা শিশু ও যুবদের অভিভাবক – অভিভাবিকাদের সঙ্গে শিশু, যুবদের রক্ষা করা ও লক্ষ্য রাখার জন্য নানান পরামর্শ দিয়ে থাকি।এতে আমরা বেশ সফল ও হচ্ছি। ‌ষষ্ঠ বার্ষিক এই রথের কার্ণিভ্যাল এবং রথের প্রতিযোগিতায় প্রতিযোগীদের উৎসাহিত করার জন্য উপস্থিত ছিলেন জাঙ্গিপাড়া কেন্দ্রের বিধায়ক প্রসেনজিৎ বাগ,বিদগ্ধ শিক্ষাবিদ – কবি- সাহিত্যিক ও সমালোচক অশোক অধিকারী,বিদগ্ধ শিক্ষাবিদ,কবি,সমালোচক ও ভাস্কর্য শিল্পী সত্যব্রত মন্ডল,বিদগ্ধ শিক্ষাবিদ ও নাট্যকার নিতাই কোনার, লোকসংস্কৃতি গবেষক,কবি এবং সাংবাদিক অভিজিৎ হাজরা প্রমুখ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। রথের কার্ণিভ্যাল এবং রথের প্রতিযোগিতায় চারজন বিচারক মন্ডলী রথের সামগ্ৰিক সৌন্দর্য, রথের সাজসজ্জা, মৌলিকতা, শৈল্পিক নৈপুণ্য, সদস্যদের বেশভূষা বিষয় গুলির ভিত্তিতে বিচারকার্য সম্পন্ন করেন। বিচারকদের বিচারে২৩ টি অংশগ্রহণকারী দলের প্রতিযোগীদের অংশগ্রহণে প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ,ও পঞ্চম স্থান অর্জন করে যথাক্রমে হলুদ বরণ গ্ৰুপ, নতুনের ছোঁয়া গ্ৰুপ, রামধনু গ্ৰুপ,তিন নদীর খেলা গ্ৰুপ, দুষ্টু ছেলে গ্ৰুপ।স্থানাধীকারী দল গুলিকে যথাক্রমে বিশ্বনাথ মাইতি স্মৃতি পুরস্কার মেমেন্টো ও নগদ দুই হাজার টাকা,পান্নাবালা দাস স্মৃতি পুরস্কার মেমেন্টো ও নগদ দেড় হাজার টাকা, নিরঞ্জন মন্ডল স্মৃতি পুরস্কার মেমেন্টো ও নগদ এক হাজার টাকা, পূর্ণিমা শীল স্মৃতি পুরস্কার মেমেন্টো ও নগদ সাতশত টাকা এবং হরেন্দ্রনাথ বেরা স্মৃতি পুরস্কার মেমেন্টো ও নগদ পাঁচশত টাকা প্রদান করা হয়। এছাড়াও প্রতিযোগিতায় অংশগ্ৰহণকারী অন্য আঠারোটি গ্ৰুপের সব সদস্য – সদস্যাদের মেমেন্টো প্রদান করে উৎসাহিত এবং সম্মানিত করা হয়। মহতী এই রথের কার্ণিভ্যাল এবং রথের প্রতিযোগিতায় সংগীত পরিবেশন করেন অলকেশ মাইতি,সৃজা মাইতি,সৃজিতা মুখার্জী, জয়দেব ঘোষ, চন্ডীদাস চন্দ্র। আবৃত্তি পরিবেশন করেন আরাধ্যা মুখার্জী,শ্রেষ্ঠা শাসমল,রমা দে। নৃত্য পরিবেশন করেন সম্পূর্ণা প্রামাণিক, অনিন্দিতা মন্ডল, মল্লিকা পাল। রথের কার্ণিভ্যাল এবং রথের প্রতিযোগিতা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং পুরষ্কার বিতরণী অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন অভিনেতা এবং এই উৎসবের মূল নায়ক গৌতম বাকুলী।

Leave a Reply