মলয় দে নদীয়া : বছরের প্রথমদিন মানেই বাড়ির থেকে দূরে কোথাও গিয়ে বা ভাগীরথীর তীরবর্তী অঞ্চলে অথবা গার্ডেন বা কোনো আম বাগানে গিয়ে উচ্চস্বরে মাইক বাজিয়ে সদলবলে আমিষ জাতীয় খাদ্য খাবার গ্রহণ করা বিষয়টি পিকনিক হিসাবে পরিচিত । সাধারণ ভাবে এই চালচিত্রই দেখতে অভ্যস্ত আমরা বছরের প্রথম দিনে । কিন্তু ফার্স্ট জানুয়ারিতে অর্থাৎ বছরের প্রথম দিনে জমিদার দিন দয়াল বাবুর ঠাকুর বাড়ির পিকনিকের চিত্রটা সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির । এখানে তাদের বাড়ির বিগ্রহ রাধা রমনকে সাথে নিয়ে পিকনিকের রেওয়াজ চালু হয়েছে মূলত বিগত বছর থেকে এমনটাই তাদের পরিবার সূত্রে জানা গেলো । অর্থাৎ এই দিন এই বাড়ির বিগ্রহ রাধা রমনের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন ব্যঞ্জন সহ নিবেদিত অন্ন ভোগ পরিবারের মানুষজন , তাদের বন্ধু বান্ধব আত্মীয় পরিজন মধ্যান্যের আহার হিসাবে গ্রহণ করেন এবং মূলত এই চিত্রটাই পিকনিকের রূপ নেয় । বছরের প্রথম দিনেই চারিদিকে যেভাবে মাছ মাংস সহ বিভিন্ন আমিষ জাতীয় খাবারের হিড়িক ছড়িয়ে পড়ে , ঠিক তারই মাঝে ঈশ্বর রাধারমণের প্রসাদ অর্থাৎ নিরামিষ খাবারের পিকনিক একদমই একটি ব্যতিক্রমী চিত্র । এমন ঘটনারই আজ সাক্ষী থাকলাম আমরা । যদিও রাধা রমনের পুজো ও আরতি সম্পন্ন করে তারপরে ভোগ নিবেদন করা হয় এবং সব শেষে সেটা পিকনিকের রূপ পেলো বিশেষ করে আজকের দিনে । বলা যায় এই প্রজন্মের বেশ কিছু ছেলে মেয়ে এমন ভাবধারায় সামিল হয়েছে । তারা অনেকেই তাদের নিকটস্থ আত্মীয় পরিজন বা বন্ধুবান্ধব দের পিকনিক ছেড়ে এসে এই পিকনিকে সামিল হয়েছে । তাদের কয়েক জনের সাথে কথা বলে নিলাম আমরা । প্রসঙ্গক্রমে বলা যায় ১২০৭ বঙ্গাব্দে তৈরি হয়েছিল জমিদার দীন দয়াল বাবুর ঠাকুর ঘরের সামনের এই সাত খাটাল বিশিষ্ট ঠাকুর দালান । এই অপূর্ব ঠাকুর দালান টি নির্মাণ করেছিলেন এই বাড়ির পূর্ব পুরুষ শ্রী রাম চন্দ্র প্রামাণিক । পরবর্তীকালে এই বাড়ির দাশুবাবু মন্দিরটির আধুনিকি করন করেন । এই দাশু বাবুর পুত্র ছিলেন জমিদার দীন দয়াল প্রামাণিক । সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষ , দীন দুঃখী , আর্ত ও নিপীরিত মানুষের প্রতি তার যথেষ্ট মহানুভবতা ছিল । এই পরিবারের অপর এক পণ্ডিত ব্যাক্তিত্ব ছিলেন শ্রী যশোদা নন্দন প্রামাণিক । তিনি তত্কালীন সময়ে শান্তিপুর মিউনিসিপ্যাল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন , সেই সময় শান্তিপুর মিউনিসিপ্যাল উচ্চ বিদ্যালয় ওল্ড ইংলিশ স্কুল নামে পরিচিত ছিল । তার নামানুসারেই এই ঠাকুর বাড়ীর সামনের রাস্তা যশোদা নন্দন প্রামাণিক স্ট্রিট হিসাবে পরিচিত । রাসের সময় সম্পূর্ণ বেলোয়ারী ফানুসে সুসজ্জিত করে এক মনোরম স্বর্গীয় পরিবেশের সৃষ্টি করা হয় এই দীন দয়াল ঠাকুর বাড়ি তে । শান্তিপুরের সাধারণ মানুষ ও বাইরের অগণিত রাস দর্শনার্থীদের কাছে জমিদার দীন দয়াল ঠাকুর বাড়ির রাস দর্শন না করলে যেনো রাস উৎসব অসম্পূর্ণ থেকে যায় । এছাড়াও এই বাড়িতে রাস ছাড়াও দোল ,ঝুলন , জন্মাষ্টমী , রাধা অষ্টমী র মত ধর্মীয় অনুষ্ঠান স সাড়ম্বরে পালিত হবার রীতি রয়েছে । তবে একটি তাৎপর্য পূর্ণ বিষয় হলো দুর্গা পুজোর একাদশী থেকে জগদ্ধাত্রী পুজোর একাদশী পর্যন্ত এখানে মঙ্গল আরতি অনুষ্ঠিত হবার রেওয়াজ রয়েছে ।তবে ২০২২ সালের ফাস্ট জানুয়ারিতেও সমস্ত ধর্মীয় নীয়মাবলী বজায় রেখে পিকনিকের চিরা চরিত ধারার বাইরে গিয়ে রাধা রমনের উদ্দেশ্যে নিবেদিত প্রসাদের পিকনিক বছরের শুরুতে একটি নতুন মাত্রা যোগ করলো বলে অনেকের অভিমত ।
