সোশ্যাল বার্তা: নদিয়ার রাজপরিবারের এই পুজো শতাব্দীপ্রাচীন এবং এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের নাম ও বহু ঐতিহাসিক স্মৃতি।
কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির দুর্গাপুজো এবং রাজমাতাদের আরাধনার সূচনা হয়েছিল আঠারো শতকে নদিয়ার বিখ্যাত মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের রাজত্বকালে। মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র ছিলেন শাক্ত ধর্মের উপাসক এবং সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক। তাঁর আমলেই নদিয়ায় জাঁকজমকপূর্ণভাবে দুর্গাপুজো এবং বিভিন্ন দেবদেবীর পুজো শুরু হয়। রাজবাড়ির অন্দরে ও প্রাঙ্গণে পূজিত দেবতারা রাজ পরিবারের কুলদেবী হিসেবে আজও পূজিত হয়ে আসছেন।
রাজ রাজেশ্বরী মাতা দেবী দুর্গারই একটি অন্য রূপ বা মহিষাসুরমর্দিনী রূপের এক বিশেষ প্রকাশ। এখানে দেবতাকে রাজরাজেশ্বরী বা ত্রৈলোক্যমোহিনী রূপে কল্পনা করা হয়, যা রাজকীয়তা ও শক্তির প্রতীক।
রাজবাড়ির এই প্রতিমা এবং পুজোয় প্রাচীন রাজকীয় ঐতিহ্যের ছাপ স্পষ্ট। দেবীকে সোনা, রূপা ও ঐতিহ্যবাহী বহুমূল্যবান অলংকারে ভূষিত করা হয়। প্রতিমার নির্মাণশৈলীতেও এক বিশেষ আভিজাত্য বজায় রাখা হয়, যা বংশপরম্পরায় চলে আসছে।
রাজ রাজেশ্বরী মাতা ও দুর্গোৎসব কেবল একটি বার্ষিক উৎসব নয়, এটি কৃষ্ণনগর রাজপরিবারের মূল আরাধ্যা শক্তির আধার। রাজ পরিবারের সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধির কামনায় এই পুজো অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে সম্পন্ন হয়।
পুজোর বিশেষ আচার ও ঐতিহ্য রয়েছে। রাজবাড়ির পুজোয় সনাতন বৈদিক ও শাক্ত মতেই সমস্ত আচার-অনুষ্ঠান পালিত হয়। পুজোর সময় ঐতিহ্যবাহী নিয়ম ও আচার কঠোরভাবে মেনে চলা হয়।
প্রাচীন প্রথা অনুযায়ী রাজবাড়ির পুজোয় ঐতিহ্যবাহী ভোগ ও নৈবেদ্য নিবেদন করা হয়। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক জায়গায় বলিপ্রথার ধরনে পরিবর্তন এসেছে কিংবা প্রতীকী বলি দেওয়া হয়।
অতীতে রাজবাড়ির পুজোয় বিশেষ তোপধ্বনি ও রাজকীয় বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার হতো, যা আজও ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন বাদ্য ও ঢাকের শব্দে ফুটিয়ে তোলা হয়। দশমীর দিনে প্রতিমা বিসর্জনের সময় রাজপরিবারের সদস্য এবং স্থানীয় মানুষের ঢল নামে।
কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির পুজোর বর্তমান রূপ
আজও শতবর্ষ পেরিয়ে এসেও কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির দুর্গোৎসব তার প্রাচীন আভিজাত্য ও গাম্ভীর্য ধরে রেখেছে। কৃষ্ণনগরের রাজবাড়ি প্রাঙ্গণ এই পুজোকে কেন্দ্র করে এক মিলনমেলায় পরিণত হয়। প্রতি বছর পুজোর দিনগুলোতে সাধারণ মানুষ ও দর্শনার্থীরা রাজবাড়ির এই ঐতিহ্যবাহী পুজো দেখতে এবং দেবীর আশীর্বাদ নিতে ভিড় জমান।
কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির রাজ রাজেশ্বরী মাতা ও দুর্গোৎসব শুধুমাত্র একটি পূজাপার্বণ নয়, এটি বাংলার শাক্ত সংস্কৃতির এক অমূল্য দলিল এবং নদীয়ার গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের এক জীবন্ত সাক্ষী।
