হকার উচ্ছেদের মধ্যেই আশার আলো! বছরে মাত্র ২৪ হাজার টাকারও কমে রেলওয়ে প্ল্যাটফর্মে স্থানীয় পণ্য বিক্রির সুযোগ

Social

হকার উচ্ছেদের মধ্যেই আশার আলো! বছরে মাত্র ২৪ হাজার টাকারও কমে রেলওয়ে প্ল্যাটফর্মে স্থানীয় পণ্য বিক্রির সুযোগ

মলয় দে: রেলস্টেশন চত্বরে অবৈধ দখলদারি ও অননুমোদিত হকারদের বিরুদ্ধে রেল কর্তৃপক্ষের ধারাবাহিক উচ্ছেদ অভিযান চললেও, এর মধ্যেই ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য উঠে এসেছে এক নতুন আশার বার্তা। অনেকেরই ধারণা, রেলওয়ে প্ল্যাটফর্মে দোকান বা স্টল পেতে হলে লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করতে হয় কিংবা রাজনৈতিক বা বিশেষ প্রভাবের প্রয়োজন হয়। বাস্তবে কিন্তু ভারতীয় রেলওয়ের বর্তমান নীতিতে সম্পূর্ণ আইনি ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে স্বল্প খরচে স্টেশনে ব্যবসা করার সুযোগ রয়েছে।

ভারতীয় রেলওয়ে ও আইআরসিটিসি যৌথভাবে বর্তমানে ই-টেন্ডার ব্যবস্থার মাধ্যমে স্টল ও দোকান বরাদ্দ করে থাকে। ১৮ বছর ঊর্ধ্ব যেকোনো ভারতীয় নাগরিক, যার বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধমূলক রেকর্ড নেই, তিনি নির্ধারিত নিয়ম মেনে আবেদন করতে পারেন। আবেদন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ অনলাইনে পরিচালিত হয়। সরকারি আইআরইপিএস পোর্টালের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট স্টেশনের জন্য প্রকাশিত টেন্ডারে অংশগ্রহণ করতে হয়। প্রয়োজনীয় নথির মধ্যে থাকে পরিচয়পত্র, ঠিকানার প্রমাণ, প্যান কার্ড, ব্যাংক সংক্রান্ত তথ্য এবং খাদ্যদ্রব্য বিক্রির ক্ষেত্রে এফএসএসএআই লাইসেন্স ও জিএসটি সংক্রান্ত নথি।

সাধারণভাবে বড় স্টেশনগুলিতে লাইসেন্স ফি, সিকিউরিটি ডিপোজিট ও অন্যান্য খরচের পরিমাণ তুলনামূলক বেশি হলেও ছোট ও মাঝারি স্টেশনগুলিতে পরিস্থিতি ভিন্ন। নদিয়ার শান্তিপুর রেলওয়ে স্টেশনের এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী রাজীব ভট্টাচার্যের অভিজ্ঞতা সেই ধারণাকেই নতুনভাবে সামনে এনেছে।

রাজীববাবু জানান, স্টেশনের একটি কাপড়ের দোকানের লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তিনি নিয়ম মেনে অনলাইনে আবেদন করেন এবং টেন্ডারের মাধ্যমে স্টল বরাদ্দ পান। তাঁর দাবি, সাধারণ মানুষের মধ্যে যে ধারণা রয়েছে যে স্টেশনে দোকান পেতে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়, তা সব ক্ষেত্রে সঠিক নয়। শান্তিপুরের মতো স্টেশনে বিশেষ প্রকল্পের আওতায় তিনি বছরে প্রায় ২৪ হাজার টাকারও কম খরচে ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ পেয়েছেন।

তবে এই সুযোগের সঙ্গে রয়েছে কিছু গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। সংশ্লিষ্ট স্কিমের অধীনে শুধুমাত্র স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হস্তশিল্প, কুটির শিল্পজাত সামগ্রী বা এলাকার ঐতিহ্যবাহী পণ্য বিক্রি করা যায়। রাজীববাবুর দোকানে বিক্রি হওয়া প্লাস্টিকের শো-পিস, কৃত্রিম ফুল ও বিভিন্ন সাজসজ্জার সামগ্রী শান্তিপুরের বাগচি বাগান এলাকার মহিলাদের হাতে তৈরি। ফলে এই উদ্যোগ শুধু একজন ব্যবসায়ীর আয়ের পথ খুলে দেয়নি, বরং বহু গ্রামীণ মহিলার কর্মসংস্থানেরও সুযোগ তৈরি করেছে।

রেল কর্তৃপক্ষের এই উদ্যোগ স্থানীয় উৎপাদনকে বাজারের সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রীর সামনে স্থানীয় শিল্পীদের তৈরি পণ্য তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হওয়ায় বিক্রিও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

এদিকে উত্তরবঙ্গের নিউ জলপাইগুড়ি, শিলিগুড়ি জংশন, নিউ মাল জংশনসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনেও নিয়মিত নতুন টেন্ডার ও ই-অকশন প্রকাশ করা হচ্ছে। ফলে নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য বৈধ উপায়ে রেলওয়ে প্ল্যাটফর্মে ব্যবসা শুরু করার সুযোগ ক্রমশ বাড়ছে।

হকার উচ্ছেদের আবহে তাই একথা স্পষ্ট যে, অবৈধভাবে ব্যবসা নয়— বরং সরকারি নিয়ম মেনে, স্বল্প খরচে এবং সম্পূর্ণ স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় রেলওয়ে প্ল্যাটফর্মে স্থানীয় পণ্য বিক্রির সুযোগ এখন বাস্তব। উদ্যোগ, পরিকল্পনা ও সঠিক তথ্য থাকলে বছরে মাত্র চব্বিশ হাজার টাকারও কম খরচে একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাও গড়ে তুলতে পারেন নিজের ব্যবসার নতুন ঠিকানা।

Leave a Reply