মলয় দে: নদীয়ার গয়েশপুর অঞ্চল শান্তিপুর ব্লকের একেবারে শেষ প্রান্তে অবস্থিত। চারদিকে খাল, বিল ও হাওড়ে বেষ্টিত এই অঞ্চল প্রকৃতির এক অনন্য নিদর্শন। ‘গঙ্গাভক্তি তরঙ্গিনী’-তে উল্লেখ রয়েছে যে গঙ্গার তীরেই শান্তিপুরের অবস্থান। এসব তথ্য থেকে অনুমান করা যায়, অতীতে এই অঞ্চলে গঙ্গার গতিপথ বহুবার পরিবর্তিত হয়েছে।
নবদ্বীপ থেকে প্রবাহিত প্রাচীন গঙ্গা একসময় শান্তিপুরের উপর দিয়ে প্রবাহিত হতো। তার একটি শাখা ম্বরূপগঞ্জের দক্ষিণে পৌঁছে যায়। এখানেই নদীয়ার মহারাজা বসবাসের জন্য গঙ্গাবাস পরে” ‘আনন্দবাস’ নামে গ্রাম প্রতিষ্ঠা করেন। এই শাখাটি আনন্দবাসের দক্ষিণ দিক দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বাওসাডাঙা, সগুনা ও ভোলাভাঙ্গার পশ্চিম দিয়ে এসে ‘বাগদেবী’ নামে পরিচিত হয়। অন্য একটি শাখা বাগদেবীর খাল থেকে পূর্বদিকে প্রবাহিত হয়ে দিগনগরের দিকে চলে যায়। সুগুনার বিল ও দিগনগরের দিকে বিস্তৃত বিলটি ‘গোপীয়ার বিল’ নামে পরিচিত।আর এখানেই অবস্থান করছে সুরোধনী নদী।এই সুরোধনী নদী ও ভাগীরথী নদীর মাঝখানে এক উঁচু দ্বীপের মতো অবস্থান করছে গয়েশপুর। চারদিকে জলবেষ্টিত এই গ্রাম যেন প্রকৃতির কোলে গড়ে ওঠা এক ছোট্ট দ্বীপ, যেখানে প্রকৃতি, সংগ্রাম ও স্বপ্ন একসূত্রে গাঁথা।
“দুই নদীর বুকে এক টুকরো মাটি,
সেখানেই মানুষের স্বপ্ন গাঁথা অমাটি।”
এই প্রত্যন্ত অঞ্চলে যোগাযোগ ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই অত্যন্ত দুর্বল। এমন দুর্গম পরিবেশে আজ থেকে প্রায় ১০০ বছর আগে শিক্ষা ব্যবস্থার কথা চিন্তা করাও ছিল দুঃসাধ্য। তবুও কিছু শিক্ষানুরাগী মানুষের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত হয় গয়েশপুর জুনিয়র বেসিক স্কুল। আজ সেই বিদ্যালয়ের শতবর্ষ পূর্তি—এ এক গর্বের ইতিহাস।
“যেখানে আজও পথ কঠিন,
সেখানে একদিন জ্বলে উঠেছিল শিক্ষার প্রদীপ।”
স্বামী বিবেকানন্দ-এর সেই অমর বাণী যেন এই গ্রামের মানুষের প্রাণে প্রতিধ্বনিত হয়—
“উঠো, জাগো, এবং লক্ষ্য না পাওয়া পর্যন্ত থেমো না।”
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর অনুভব যেন এখানে সত্য হয়ে ওঠে—
“বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই আমি পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে যাই না আর।”
গয়েশপুর শুধু একটি গ্রাম নয়—
এটি নদীর বুকে ভেসে থাকা এক ইতিহাস,
সংগ্রামের মাঝে জেগে থাকা এক আলোর প্রদীপ।
“অন্ধকার যতই গভীর হোক,
দুই নদীর মাঝেও আলো জ্বলে—
সেই আলোর নাম গয়েশপুর।”
আর এই গয়েশপুর অঞ্চলে তৈরি গয়েশপুর জুনিয়ার বেসিক স্কুলে। যার শতবর্ষ পূর্তি উপলক্ষে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।এক শতাব্দীর এই গৌরবময় যাত্রা শুধু একটি বিদ্যালয়ের ইতিহাস নয়, এটি শিক্ষা, সংস্কৃতি ও মানবিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
