দ্বীপ গ্রামের কথা

Social

মানব মন্ডল: দ্বীপগ্রাম। প্রাচীন গ্রন্থে এরকমই নাম আছে।জায়গাটার বর্তমান নাম দ্বীপা। হুগলী জেলার আহল্যাবাঈ রোড ধরে গজারমোড় থেকে চাঁপাডাঙার দিকে কয়েক কিলোমিটার গেলেই দ্বীপা। প্রায় চারশ বছর আগে এই স্থানকে বেষ্টন করে তিন দিক দিয়ে তিনটি নদী প্রবাহিত হত। নদীগুলো হল কৌশিকী, বিমলা ও দামোদর। তাই সম্ভবত দ্বীপ থেকেই দ্বীপা কথাটা এসেছে। চৈতন্য মহাপ্রভু অপ্রকট হবার কিছুদিন পরেই এখানে আসেন তাঁর অন্যতম পার্ষদ শ্রীশ্রী কৃষ্ণানন্দপুরী। তিনি নিজে এখানে গৌরগোপাল বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেন এবং হরিনাম বিতরণ করেন।

একদিন কৃষ্ণানন্দ পুরী পূজার উপকরণ নিয়ে দামোদরের ঘাটে নেমেছেন,এমন সময় দামোদর তার প্রবল স্রোতে পুজোর জিনিসপত্র সব ভাসিয়ে নিয়ে যায়। কৃষ্ণানন্দ পুরী অভিশাপ দেন, “আমার পূজার দ্রব্যাদি তুই ভাসিয়ে দিলি,দেখতে পেলি না…তোর চোখ কানা হয়ে যাক…”। সেই থেকে নাকি দামোদরের এই প্রাচীন খাতটি ক্ষীণ হয়ে পড়ে এবং পাঁচ কিলোমিটার পশ্চিমে চাঁপাডাঙার কাছ দিয়ে যে খাতটি ছিল সেটি প্রবল হয়। এইসব কিংবদন্তীর কতটা ঐতিহাসিক মূল্য আছে তা জানা না গেলেও বন্দিপুর,পাড়াম্বুয়া, লোকনাথ,সাহাবাজার,দ্বীপা,দ্বারহাট্টা এইসব জায়গার পাশ দিয়ে যে ছোট নদীটি বর্তমানে প্রবাহিত হচ্ছে তাকে লোকে এখন কানা দামোদর নামেই ডাকে।তাই অভিশাপের ফলেই হোক আর যাই হোক,দামোদর যে মাঝে মাঝেই তার গতিপথ পরিবর্তনে অভ্যস্ত ছিল তা মেজর হার্টসের মানচিত্র দেখলে বেশ বোঝা যায়। এছাড়া সহদেব চক্রবর্তীর ধর্মমঙ্গলে হুগলীর বন্দীপুরকে দামোদরের তীরে বলে নির্দেশ করা হয়েছে। আজ সেখানে গেলে এই কানা দামোদরই দৃষ্ট হয়। এদিকে হরিপালে গেলে কৌশিকী নদীর চিহ্ন আজও দেখা যায়। কৌশিকী গেল,দামোদর গেল…কিন্তু বিমলা? নাঃ তার চিহ্নটুকুও কোথাও নেই। তাই দ্বীপাকে এখন কোনভাবেই দ্বীপ বলা যায় না। এসবের মধ্যেই মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে কৃষ্ণানন্দপুরীর পাট ও মহাপ্রভু জিউর মন্দির। প্রাচীন রথও আবৃত অবস্থায় চোখে পড়ে। রথের সময় এখানে খুব ধুমধাম হয়। এছাড়া নিত্যপূজা তো হয়ই। চৈতন্য মহাপ্রভু,নিত্যানন্দ,রাধাগোবিন্দ ও রাধারানীর মূর্তি এখানে নিত্যপূজা পাচ্ছেন। পূজারী মশাই ইতিহাস বিমুখ নন। তাঁর মুখে ইতিহাসমিশ্রিত জনশ্রুতি শুনতে বেশ ভাল লাগে।

খানাকুলের বৈষ্ণবগন কৃষ্ণানন্দ কে অভিরাম গোস্বামীর শিষ্য বলে মনে করেন। কিন্তু ঠাকুরমশাইয়ের এতে প্রবল আপত্তি। আপত্তির অবশ্যই যথেষ্ট কারণ আছে। শ্রীচৈতন্য চরিতামৃতে যে ভক্তিকল্প বৃক্ষের বর্ননা আছে তাতে আছে—
“বিষ্ণুপুরী কেশবপুরী পুরী কৃষ্ণানন্দ।
নৃসিংহানন্দ-তীর্থ আর পুরী সুখানন্দ।।”
অর্থাৎ কৃষ্ণানন্দকে ভক্তিকল্পবৃক্ষের নবমূলের একটি মূল হিসাবে বলে ঠাকুর মশাই কোন ভুল করেন নি। এ স্থান সত্যিই বৈষ্ণবদের কাছে পূণ্যভূমি।

Leave a Reply