মলয় দে নদীয়া :-নদীয়ার প্রাচীন ধর্মীয় নগরী শান্তিপুর—যেখানে বারো মাসে তেরো পার্বণ লেগেই আছে। এখানকার মানুষ ছোট থেকে উৎসব, আচার-অনুষ্ঠান এবং মাটির প্রতিমার পরিবেশের মধ্যে বেড়ে ওঠে। ফলে অনেকে কুম্ভকার সম্প্রদায়ভুক্ত না হয়েও বা পরিবারের কারও হাতে মৃৎশিল্পের অভিজ্ঞতা না থাকলেও নিজে থেকেই প্রতিমা গড়ার প্রতি আকৃষ্ট হন। শান্তিপুর শহরের ডাবরেপাড়ার দাস পরিবারের সদস্য প্রিয়াংশু দাসও তাদেরই একজন।
প্রিয়াংশু বর্তমানে কৃষ্ণনগর কলেজিয়েট স্কুলের দ্বাদশ শ্রেণীর ছাত্র এবং এবছরের উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী। ছোটবেলা কেটেছে শান্তিপুরের ডাবরেপাড়ায়, যদিও পড়াশোনার কারণে বেশিরভাগ সময় মামার বাড়ি কৃষ্ণনগরের উকিলপাড়ায় থাকত সে। আগামীকাল থেকেই তার উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা শুরু হলেও, শেষ মুহূর্তে দুর্গামূর্তিতে তুলির টান দিচ্ছে এই তরুণ শিল্পী। পরীক্ষার মাঝে মনোযোগ সহকারে পড়াশোনা শেষে আবার পরীক্ষার পর পূর্ণোদ্যমে প্রতিমা তৈরির কাজে নেমে পড়বে সে।
প্রিয়াংশুর মাটির প্রতিমা বানানোর প্রতি ঝোঁক শুরু হয়েছিল ছোটবেলাতেই। তৃতীয় বা চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ার সময় প্রথম দুর্গামূর্তি বানায় সে। তখন থেকেই শুরু হয় তার এই সৃজনশীল যাত্রা। পরিবারে কেউ মৃৎশিল্পের সঙ্গে যুক্ত না থাকলেও তার আগ্রহ থেমে থাকেনি। বরং প্রতিবারই সে নিজে নিজেই শিখে নিয়েছে প্রতিমা তৈরির খুঁটিনাটি। মাঝে মাঝে পাড়ার শিল্পী জগন্নাথ প্রামানিক বা বিখ্যাত সাজসজ্জা শিল্পী অমর কুন্ডুর কাছে যেত মনের টানে। তাদের কাছ থেকে প্রেরণা পেয়েই ধীরে ধীরে নিজের কাজ নিখুঁত করেছে প্রিয়াংশু।
কেবল প্রতিমা নয়, সে নিজেই তৈরি করে প্রতিমার সাজ, চালচিত্র ও অলংকরণ। এভাবেই গড়ে ওঠে তার মিনিয়েচার প্রতিমাগুলি। প্রিয়াংশুর তৈরি প্রতিমা শুধুমাত্র শখের বস্তু হয়েই থেমে থাকেনি, সামাজিক মাধ্যমে সেগুলির প্রচারও হয়েছে এবং অনেক মূর্তি বিক্রি করেছে সে। দুর্গা, কালী, সরস্বতী, লক্ষ্মী, অন্নপূর্ণা, জগদ্ধাত্রী প্রায় সব ধরনের প্রতিমাই বানিয়েছে সে, তবে সবই ছোট আকারে।
প্রায় পাঁচ-ছয় বছর আগে প্রথম এক গৃহস্থ পরিবার তার কাছ থেকে অন্নপূর্ণা মূর্তি কিনে নিয়ে যায় এবং সঠিক পারিশ্রমিক দেয়। সেই থেকেই আত্মবিশ্বাস বাড়ে প্রিয়াংশুর এবং তারপর থেকে নিয়মিত প্রতিমা তৈরি করে আসছে সে। এবছরের দুর্গাপূজার জন্যও সে বানিয়েছে এক অনন্য দুর্গামূর্তি, যেটি একেবারে প্রাচীন ঘরানার। সচরাচর এমন মূর্তি দেখা যায় না। এখানে সিংহের বদলে দেবী দুর্গার বাহন হিসেবে রয়েছে ঘোটক। এক মাসের পরিশ্রমে তৈরি হয়েছে এই মিনিয়েচার প্রতিমাটি।
প্রিয়াংশুর মা পিংকি দাস জানান, “আগামীকাল উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা আজকে আমি বাপের বাড়ি এসে দেখি পড়াশোনা বাদ দিয়ে ঠাকুর নিয়ে ব্যস্ত ও। ছোটবেলা থেকেই মাটির প্রতি ঝোক মাটি নিয়েই খেলতে ভালবাসত। ওর বানানো ঠাকুর কলকাতা এবং তার বাইরে বিভিন্ন জায়গায় ইতিমধ্যেই গিয়েছে। আমাদের বংশে কেউ এর আগে মৃৎশিল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিল না। ওর মধ্যে নিজে থেকে এই শখ এসেছে। আমাদের ইচ্ছে আছে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করলে ওকে আর্ট কলেজে ভর্তি করব”।
আগামী চতুর্থীর দিন কৃষ্ণনগরের বউবাজারে পুজো হবে প্রিয়াংশুর গড়া এই দুর্গামূর্তির। স্থানীয় মহলে ইতিমধ্যেই প্রশংসা কুড়িয়েছে তার সৃজনশীলতা। পড়াশোনায় মনোযোগী হলেও মাটির গন্ধ আর শিল্পকর্মের প্রতি অদম্য টান তাকে নিয়েছে অন্য এক দিকের সৃজনশীল জগতে। পরিবারও এখন চায়, উচ্চ মাধ্যমিকের পর তাকে শিল্পকলার দুনিয়ায় আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে। পরিকল্পনা রয়েছে, ভবিষ্যতে তাকে ভর্তি করানো হবে আর্ট কলেজে, যেখানে সে আনুষ্ঠানিকভাবে শিল্প বিষয়ে পড়াশোনা করতে পারবে।
প্রিয়াংশুর গল্প আবারও প্রমাণ করে, নদীয়ার শান্তিপুর শুধুমাত্র ধর্মীয় আচার নয়, শিল্প-সংস্কৃতিরও আঁতুড়ঘর। এখানকার পরিবেশ মানুষকে যেমন পার্বণপ্রিয় করে তোলে, তেমনই শিখিয়ে দেয় সৃজনশীলতার মূল্য। আর তাইতো পড়াশোনার পাশাপাশি প্রতিমা গড়ার মতো এক শিল্পভাবনা গড়ে উঠেছে প্রিয়াংশুর মতো তরুণ শিল্পীর হাতে।
এভাবেই একদিকে উচ্চ মাধ্যমিকের প্রস্তুতি, অন্যদিকে দুর্গা প্রতিমার শেষ মুহূর্তের সাজসজ্জা দুটি সমান্তরাল পথ একসাথে এগিয়ে নিচ্ছে শান্তিপুরের প্রিয়াংশু। ভবিষ্যতের শিল্পী হওয়ার পথে এই কিশোরই নদীয়ার আগামী দিনের শিল্প ঐতিহ্যকে নতুন মাত্রা দিতে পারে।
