প্রকৃতি ও ঐতিহ্যের মেলবন্ধন: শান্তিপুর রামনগর চরে আদিবাসী সমাজের ঐতিহ্যবাহী করম পরব উদযাপিত
মলয় দে: প্রকৃতি বন্দনা, ভালো ফসলের আকাঙ্ক্ষা এবং ভ্রাতৃত্বের অঙ্গীকার নিয়ে প্রতি বছরের মতো এ বছরও রামনগর চর পুরাতন আদিবাসী পাড়ার ঝুমুরিয়া আখড়ায় পালিত হলো আদিবাসী সমাজের প্রাচীনতম লোকউৎসব ‘করম পরব ও করম পূজা’। ভাদ্র মাসের শুক্লা একাদশী তিথিতে কৃষি ও প্রকৃতির গভীর মেলবন্ধনে মুখরিত হয়ে ওঠে গোটা প্রাঙ্গণ।
উৎসবের সূচনা হয়েছিল পূজার কয়েক দিন আগে ‘জাওয়া পাতা’র মাধ্যমে। অবিবাহিত কুমারী মেয়েরা বাঁশের ডালা ও টুপায় বালি ভর্তি করে মটর, মুগ, বুট, জুনার ও কুত্থির তেল-হলুদ মাখানো বীজ বপন করেন। একাধিক বীজযুক্ত ‘সাঙ্গী জাওয়া’ ও একক বীজের ‘একাঙ্গী জাওয়া’র পাশাপাশি নিভৃতে তৈরি করা হয় ‘বাগাল জাওয়া’। এই রীতির ধারক কুমারী ‘জাওয়ার মা’রা জাওয়া ঘিরে গান ও নাচে মেতে ওঠেন।
একাদশীর দিন সকালে গোবর ও আলপনায় পরিচ্ছন্ন করা হয় পূজাস্থল। গ্রামের পুরুষেরা বন থেকে করম গাছের ডাল সংগ্রহ করে আনেন, যা করম থানে পুঁতে করম ঠাকুর ও ধরম ঠাকুরের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়। দিনভর নির্জলা উপবাস শেষে সন্ধ্যায় থালায় নৈবেদ্য সাজিয়ে করম থানে উপস্থিত হন ব্রতীরা। লায়া বা পাহানের কণ্ঠে করম কাহিনি শ্রবণের পর সম্পন্ন হয় মূল পূজা।
পূজা শেষ হতেই ধামসা ও মাদলের বোলে মুখরিত হয়ে ওঠে আখড়া। সারারাত ধরে চলা ঐতিহ্যবাহী করম নাচ ও গানে জেগে থাকে আদিবাসী পল্লী।
পরদিন সকালে জাওয়া থেকে অঙ্কুরিত শস্য তুলে নিয়ে সমৃদ্ধির কামনায় বাড়ির বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে দেওয়া হয় এবং করম ডাল বিসর্জন দেওয়া হয় জলাশয়ে। সবশেষে কুমারী মেয়েরা পরস্পরের হাতে ‘করমডোর’ পরিয়ে ‘করমসখী’ হিসেবে আজীবন বন্ধুত্ব ও সুরক্ষার বন্ধনে আবদ্ধ হন। পূর্বপুরুষদের এই আবহমান লোকসংস্কৃতি ও প্রকৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতার বার্তা নতুন প্রজন্মের মাঝেও সগৌরবে ছড়িয়ে পড়েছে এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে।
